জান্নাত তোহা-র নাম জড়িয়ে ৩ মিনিটের ভিডিও
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে সেলিব্রিটি এবং জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের নাম ব্যবহার করে ভুয়ো কনটেন্ট, বিভ্রান্তিকর তথ্য বা ক্ষতিকর লিংক ছড়ানোর প্রবণতা নতুন কিছু নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং ইনফ্লুয়েন্সার জান্নাত তোহা-র নাম জড়িয়ে একটি কথিত ৩ মিনিট ২১ সেকেন্ডের ভিডিও-র খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। তবে এই ভিডিওর সত্যতা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে যে, সম্পূর্ণ বিষয়টি একটি সম্পূর্ণ সাজানো গুজব এবং নেটিজেনদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি অত্যন্ত সাধারণ একটি ক্লিকবেট (Clickbait) কৌশল। এই ধরনের অপপ্রচার কেবল একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে না, বরং সাধারণ ব্যবহারকারীদের সাইবার ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
৩ মিনিট ২১ সেকেন্ডের ভিডিওর নেপথ্য কাহিনী
গত কিছুদিন ধরে ফেসবুক, ইউটিউব এবং টিকটকের মতো জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে কিছু নির্দিষ্ট ফেক আইডি, বট অ্যাকাউন্ট এবং চটকদার পেজ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, ইনফ্লুয়েন্সার জান্নাত তোহা-র একটি গোপন ব্যক্তিগত ভিডিও ফাঁস হয়েছে। এই ভুয়ো পোস্টগুলোতে ভিডিওটির দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট করে ৩ মিনিট ২১ সেকেন্ড বলে উল্লেখ করা হচ্ছে, যা ব্যবহারকারীদের কৌতূহল বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই সমস্ত পোস্টের ক্যাপশন বা কমেন্ট বক্সে নির্দিষ্ট কিছু থার্ড-পার্টি লিংক জুড়ে দেওয়া হয় এবং ব্যবহারকারীদের সেই লিংকে ক্লিক করে পূর্ণাঙ্গ ভিডিওটি দেখার জন্য প্ররোচিত করা হয়।
“সাইবার অপরাধীরা সাধারণত তরুণ সমাজ এবং কৌতূহলী নেটিজেনদের মনস্তত্ত্বকে টার্গেট করে এ ধরনের সুপরিকল্পিত মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে থাকে, যা মুহূর্তের মধ্যে ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে যায়।”
মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রিচ বা এনগেজমেন্ট বাড়ানো এবং ফিশিং লিংকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলার জন্যই এই কৌশলটি ব্যবহার করা হয়। নিচে এই ধরনের ক্লিকবেট স্ক্যামের প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
|
স্ক্যামের কৌশল
|
মূল উদ্দেশ্য
|
সম্ভাব্য ঝুঁকি
|
|
চাঞ্চল্যকর ক্যাপশন ও থাম্বনেইল
|
ব্যবহারকারীদের কৌতূহল ও আবেগ জাগিয়ে তোলা
|
মানসিক বিভ্রান্তি ও ভুল তথ্য ছড়ানো
|
|
অপরিচিত শর্ট লিংক প্রদান
|
ব্যবহারকারীকে নির্দিষ্ট সাইটে রিডাইরেক্ট করা
|
ফিশিং ও অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং
|
|
ম্যালওয়্যার ডাউনলোড প্ররোচনা
|
ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া বা তথ্য চুরি করা
|
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও আর্থিক ক্ষতি
|
সত্য নাকি শুধুই ক্লিকবেট স্ক্যাম?
বাস্তবে ইন্টারনেটে এই নামের বা দাবির কোনো ভিডিওর অস্তিত্ব বা সত্যতা পাওয়া যায়নি। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি সুপরিকল্পিত সাইবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। যখনই কোনো সাধারণ ব্যবহারকারী ওই ৩ মিনিট ২১ সেকেন্ডের কথিত ভিডিওটি দেখার আশায় প্ররোচিত হয়ে লিংকে ক্লিক করেন, তখনই তাকে কোনো অজানা, বিপজ্জনক বা ফিশিং ওয়েবসাইটে রিডাইরেক্ট করা হয়।
এই লিংকগুলোর মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের স্মার্টফোন বা কম্পিউটারে ক্ষতিকর ম্যালওয়্যার বা অ্যাডওয়্যার ছড়িয়ে দেওয়ার ফাঁদ পাতা থাকে। অনেক সময় এসব ফিশিং পেজের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ফেসবুক, জিমেইল বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের লগইন তথ্য চুরি করা হয়, যাকে সাইবার পরিভাষায় ‘ফিশিং স্ক্যাম’ (Phishing Scam) বলা হয়। পরবর্তীতে এই হ্যাকড অ্যাকাউন্টগুলো ব্যবহার করে আরও বিভিন্ন ধরনের প্রতারণামূলক কার্যক্রম চালানো হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সতর্কতা ও আমাদের করণীয়
ডিজিটাল যুগে এ ধরনের সাইবার প্রতারণা থেকে নিজেদের সুরক্ষা রাখতে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। কোনো রকম যাচাইাই না করে চাঞ্চল্যকর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে লিংকে ক্লিক করা বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
1.যাচাই-বাছাই করা: কোনো সেলিব্রিটি বা ইনফ্লুয়েন্সার সম্পর্কে এ ধরনের চাঞ্চল্যকর দাবি দেখলে মূলধারার সংবাদমাধ্যম বা সংশ্লিষ্ট ক্রিয়েটরের অফিশিয়াল পেজ থেকে সত্যতা যাচাই করুন।
2.অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করা: সোশ্যাল মিডিয়ার কমেন্ট বক্স বা অপরিচিত পেজ থেকে দেওয়া সন্দেহজনক লিংকে কখনো ক্লিক করবেন না।
3.রিপোর্ট ও ব্লক করা: এ ধরনের ভুয়ো কনটেন্ট বা স্ক্যাম পেজ দেখতে পেলে অবিলম্বে প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব রিপোর্টিং টুলের মাধ্যমে রিপোর্ট করুন এবং ব্লক করুন।
সর্বোপরি, ডিজিটাল পরিমণ্ডলে নিরাপদ থাকতে আমাদের প্রত্যেককে আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে এবং এ ধরনের ক্লিকবেট অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।


